
বিগব্যাং-এর আগে কি সময় ছিল?
বিগব্যাং-এর আগে সময় ছিল কিনা তা নিয়ে আলোচনা, সময়ের মৌলিক সংজ্ঞা, তাপগতিবিদ্যায় এন্ট্রপি এবং স্পেসটাইম সিংগুলারিটির বিশ্লেষণ।
আচ্ছা। এই বিষয়টা বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত একটা বিষয়। তবে এর চেয়েও বিতর্কিত কিছু বিষয়ে প্রশ্ন আছে।
বিগব্যাং-এর আগে সময় ছিল কি ছিল না সে বিষয়ে চিন্তা করার আগে একটা বিষয় জানা দরকার: সময় কী?
আমরা বর্তমানে জানি যে সময় একটা মাত্রা। ঠিক দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতার মতোই। কিন্তু দৈর্ঘ্যের যেমন সংজ্ঞা দেওয়া হয় যে বস্তুর বা কোনো কিছুর যেকোনো পাশের সর্বোচ্চ দূরত্বটাই দৈর্ঘ্য, ঠিক তেমনই সময়েরও একটা যুৎসই সংজ্ঞা থাকা উচিত। রিলেটিভিটিতে যাচ্ছি না, সাধারণ, একেবারে দৈনন্দিন ভাষায় সময়ের সংজ্ঞা দেওয়া যায় পরিবর্তনের পরিমাপ হিসেবে। অর্থাৎ পরিবর্তনের পরিমাপই সময়। কিন্তু আসলে কিসের পরিমাপ?
আবারও দৈনন্দিন অবস্থা দিয়ে বোঝা যাক। বিজ্ঞান পরে হবে। তো, সময় হচ্ছে অবস্থার পরিবর্তনের পরিমাপ। আমি এখন হয়তো শুয়ে আছি, একটু পর উঠে বসব। এটা আমার অবস্থার পরিবর্তন। এই পরিবর্তন হতে কিছু সময় লাগে। আবার আমার এই লেখাটা এখনো শেষ হয়নি, একটু পর শেষ হবে। এখানেও সময় লাগবে। আশা করি বিষয়টা কিছুটা হলেও বোঝা গেছে। 🙂
এখন একটু বিজ্ঞানের দিকে যাই। যারা SSC+ তারা সবাই কমবেশি তাপগতিবিদ্যা সম্পর্কে একটু-আধটু ধারণা রাখি। খুবই ক্লাসিক্যাল বিষয়। তিনটা সূত্র আছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় সূত্রটা সময়ের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। হ্যাঁ, সময়ের সাথে সাথে এন্ট্রপি বাড়ে। এন্ট্রপি কী আবার? এন্ট্রপি হচ্ছে পোড়া মবিল। অকেজো শক্তি, যা আর কোনোভাবেই ব্যবহার করা বা কাজে লাগানো সম্ভব নয়। কেন? তাপগতিবিদ্যার অন্য সূত্রগুলো বাধা দেয়। শক্তি খরচ ছাড়া কাজ করা সম্ভব নয়। আচ্ছা, তো এই পোড়া মবিলের পরিমাণ মহাবিশ্বে দিন দিন বেড়েই চলেছে? একদিন এই মহাবিশ্বটা ওই পোড়া মবিলে ডুবে যাবে? 🙄
হ্যাঁ, ঠিক তাই। এন্ট্রপির ভালো বাংলা হচ্ছে বিশৃঙ্খলার পরিমাপ। আর এই বিশৃঙ্খলা বেড়েই চলেছে। আর এই বাড়ার পরিমাপই হচ্ছে তথাকথিত সময়। এটা ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান।
এবার আসি রিলেটিভিস্টিকভাবে সময় কী, তাতে। থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী কোনো একটি ঘটনা আসলে স্পেসটাইম কন্টিনিউয়ামে একটি স্থানাঙ্ক, যাকে মোট ৪টি কো-অর্ডিনেট দিয়ে প্রকাশ করা যায় (x, y, z, t)।
ধরি ঢাকা সংসদ ভবনের সামনে ৫ মিটার উঁচু একটি মঞ্চে বিকেল ৪টায় একজন মাননীয় মন্ত্রী কোনো বিষয়ে ভাষণ দিলেন। এটা একটা ঘটনা।
আবার বিকেল ৫টায় নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া শহীদ মিনারের সামনে কোনো এক বিষয় নিয়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হলো।
সংসদ ভবন থেকে চাষাঢ়া শহীদ মিনারের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার এবং সংসদ ভবনের মঞ্চটা মানববন্ধনের মঞ্চের চাইতে প্রায় ৭ মিটারের মতো উঁচু। এবং একটার সাথে আরেকটার সময়ের পার্থক্য ১ ঘণ্টা।
তাহলে কী দাঁড়াল? দুইটা ঘটনাকে পুরোপুরি বর্ণনা করতে হলে ৪টি করে তথ্য লাগবে। আবার দুইটা ঘটনার পার্থক্য করতেও ৪টি করে তথ্যের পার্থক্য জানা লাগবে। এদের যেকোনো একটা আলাদা হলেই দুটি ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা হবে। কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে না যাই এখন। আগেই জেনে রাখা ভালো যে এখনো পর্যন্ত রিলেটিভিটি আর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রেমটাই হলো না, বিয়ে তো দূরের কথা। 🙂
যাই হোক, আইনস্টাইন স্পেস আর টাইমকে এক করে স্পেসটাইম কেন করলেন সেটা তো ক্লিয়ার, নাকি?
এখন কথা হচ্ছে বুঝলাম সময় পরিবর্তনের পরিমাপ। কিন্তু বিগব্যাং-এর আগে সময় ছিল কিনা?
আচ্ছা, সময়ের সংজ্ঞা থেকেই বুঝে যাওয়ার কথা যে বিগব্যাং-এর আগে সময় ছিল কি ছিল না। 😉
ছিল? হ্যাঁ, ছিল। যতক্ষণ ধরে সেই সুপার অ্যাটম, কসমিক এগ, বিগব্যাং সিংগুলারিটি ছিল, সময়ও ঠিক তত সময় ধরেই ছিল। কিন্তু বৈচিত্র্যহীন। কারণ সিংগুলারিটিতে কোনো বৈশিষ্ট্যেরই বিশেষত্ব নেই। সব দলাপাকানো। পরিবর্তনেরও বিশেষত্ব নেই। ব্ল্যাকহোল সিংগুলারিটিতেও ঠিক তাই। কিন্তু সময় নামক রাশিটা ছিল, আছে এবং থাকবে। এমনকি এই মহাবিশ্বটা ওই পোড়া মবিলের মাঝে ডুবে যাওয়ার পরেও। কিন্তু সময় চলবে না, থেমে থাকবে—ঠিক বিগব্যাং-এর আগে (সিংগুলারিটি আবির্ভাব হওয়ার মুহূর্ত থেকে) যেরকমটা ছিল। 🙂
যা কিছু পরিবর্তন তা শুরুই হয়েছে বিগব্যাং থেকে, শেষ হবে এন্ট্রপি ম্যাক্সিমাম হয়ে গেলে। কোনো পরিবর্তন নেই মানে সময় আর এগোবে না, থেমে থাকবে। কিন্তু সময় থাকবে। তবে ওই সময়ের কোনো বিশেষত্ব নেই, তাই তার থাকা না-থাকারও বিশেষত্ব নেই। 🙂
তাহলে প্রশ্নটা কী হওয়া উচিত ছিল? সিংগুলারিটির আগে কি সময় ছিল? 😉

